মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ০৫:৪২ পূর্বাহ্ন

নামের মিলে বৃদ্ধের বদলে যুবকের বিনাদোষে কারাভোগ

জিহাদ হক্কানী / ১১৩ বার পঠিত
সময় : বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল, ২০২১, ১২:৩৫ অপরাহ্ণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বিদ্যুৎ বিভাগের করা বিল খেলাপির এক মামলায় বৃদ্ধের বদলে বিনাদোষে কারাভোগ করেছেন এক যুবক। আবার জামিন পেতে সেই যুবককে হতে হয়েছে নানা হয়রানি। পাশাপাশি খরচ গুনতে হয়েছে লাখ টাকা।

এমন ঘটনা ঘটিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন গাইবান্ধা নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো-২) কর্তৃপক্ষ।

বিনাদোষে কারাভোগ করা সেই যুবক একজন ডেকোরেটর ব্যবসায়ী। তার নাম মো. আব্দুল রাজ্জাক মিয়া। বয়স ৪২ বছর। বাবার নাম সমেস উদ্দিন। বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার রাধাকৃষ্ণপুর গ্রামে।

তিনি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন গাইবান্ধা নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো-১) এর গ্রাহক। অথচ ভুল করে নেসকো-২ এর দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী মামলা দিয়ে তাকে কারাভোগ করিয়েছেন চারদিন।

আর বিদ্যুৎ বিভাগের (নেসকো-২) বিল খেলাপি মামলার প্রকৃত আসামি ৮৪ বছরের বৃদ্ধ একই গ্রামের আব্দুল রাজ্জাক। তার বাবার নাম কিয়ামত উল্লা। তিনি নেসকো-২ এর গ্রাহক এবং বিল খেলাপি ছিলেন।

বিদ্যুৎ অফিসের এমন কাণ্ডে হতবাক কারাভোগ করা আব্দুল রাজ্জাক মিয়ার পরিবারসহ এলাকাবাসি। এমন ঘটনায় পর জামিনে মুক্তি পেলেও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন ও নানা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ তার স্বজনদের। আর নির্দোষ হয়েও কারাভোগের এমন ঘটনা সাজানো; নাকি বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের অবহেলা প্রশ্ন গ্রামবাসির?

ভুক্তভোগী আব্দুল রাজ্জাক মিয়া জানান, কয়েক বছর আগে তার নামের একটি সেচ পাম্প তিনি বিক্রি করেন চাচাতো ভাই শফিকুল মিয়ার কাছে। আগে থেকেই সেই পাম্পের সব বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেন তিনি। এরপর থেকে শফিকুল মিয়া সেচ পাম্পটি পরিচালনাসহ তিনিও নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে আসছেন। কিন্তু বিল খেলাপির দায়ে করা বিদ্যুৎ বিভাগের মামলায় চলতি বছরের ১৪ মার্চ গভীর রাতে ঘুম থেকে তাকে ডেকে তুলে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায় গাইবান্ধা সদর থানা পুলিশ। পরে চারদিন কারাভোগ শেষে রংপুরের বিদ্যুৎ আদালতের জামিন আদেশে গত ১৮ মার্চ মুক্তি পান তিনি।

তিনি আরও জানান, গ্রেফতারের পর জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মসনদ ও সেচ পাম্পের সকল বিদ্যুৎ বিলের কপি নিয়ে থানা ও বিদ্যুৎ অফিসে যায় তার পরিবারের লোকজন। এ সময় তারা নির্দোষ দাবি করলেও পুলিশের হাত থেকে তাকে ছাড়াতে পারেননি পরিবার।

আব্দুল রাজ্জাক মিয়া বলেন, ‘আমি একটা পাম্প চালাচিলাম। আমার নাম আব্দুল রাজ্জাক মিয়া। আমার পিতার নাম সমেস উদ্দিন। আমার একাউন্ট নম্বার ৫৬১/বি (সেচ পাম্প মিটার)। আমি নেসকো-১ এর গ্রাহক ছিলাম।

আর ২১৯০ নাম্বারে যার বিল বাকি তার নামও আব্দুল রাজ্জাক। গ্রামের নামও এক। তার পিতা হল কিয়ামত উল্লা। তিনি নেসকো-২ এর গ্রাহক। আর বিল খেলাপি।’

সেই মামলাটাতে কিভাবে, কেমনে যে আমার বাপের নাম দিয়ে আমাকে জড়াইয়া চারদিন জেল খাটালো। বুঝলাম না। এর জন্যে অনেক হয়রানি হইছি। টাকা পয়সা লোকসান হচে। এখন বাড়ির বাহিরে বাড়াতে পাচ্ছি না মুখ লজ্জায়। কাজ কামও করতে পারছি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ ধরার আগে বিদ্যুৎ অফিসে তিন-চার দিন গেছি। ওরা বলল (বিদ্যুত অফিস), কোন সমস্যা নাই। যেহেতু নাম ভুলেভুলি হচে; আমরা সংশোধন করে দেব। সেই বিশ্বাসে আমি থাকনো।’

“ওমা- হুট করি একদিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঘুম থাকি ডাকি তুলে পুলিশ হামাক (আমাকে) ধরি নিয়ে গেল। পরে জেল খাটনো চারদিন। এরমধ্যে বাড়ির লোকজন বিদ্যুৎ অফিসে গেছিল; স্যার (প্রকৌশলী) বলে- ‘ওকে জেল থেকে ছোরে আনবেন নাকছি’ সমস্যা নাই। সব ঠিক করে দেম। এদিক ফির তাই ম্যাজিস্ট্রেটক কয়; এই সেই রাজ্জাক।”

এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসহ দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া বিদ্যুৎ অফিসের এমন কাণ্ডে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন আব্দুল রাজ্জাক মিয়া।

তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, ‘আমি নিরিহ মানুষ। কার কাছে বিচার চাই; আর ক্ষতিপূরণ চাই। রাস্তা তো জানি না’।

স্বজন ও স্থানীয়রা জানান, বিদ্যুৎ বিভাগের বিল বকেয়ার দায়ে একই গ্রামের মৃত্যু কিয়ামত উল্লার ছেলে আব্দুল রাজ্জাকের নামে মামলা হয়। ৮৪ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল রাজ্জাক ২১৯০ নং মিটারের একজন বিদ্যুৎ গ্রাহক। মামলার পর আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। কিন্তু মামলায় প্রকৃত আসামি আব্দুল রাজ্জাকের পিতার নাম কিয়ামত উল্লার পরিবর্তে লেখা হয়েছে সমেস উদ্দিন। আর এই পিতার নামের ভুলে গ্রেফতারি পরোয়ানায় কারাভোগ করতে হয়েছে ডেকোরেটর ব্যবসায়ী আব্দুল রাজ্জাক মিয়াকে।

গত বছরের ৯ নভেম্বর রংপুরের বিদ্যুৎ আদালত নির্দোষ আব্দুল রাজ্জাক মিয়ার নামে সমন জারি করে। সেই সমনে তাকে ১৫ নভেম্বর আদালতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। এই সমনে বাবার নাম কিয়ামত উল্লার জায়গায় সমেস উদ্দিন লেখা হয়। আর এই ভুলে পুলিশ প্রকৃত আসামি বৃদ্ধ আব্দুল রাজ্জাকের পরিবর্তে গ্রেফতার করে নিরাপরাধ আব্দুল রাজ্জাক মিয়াকে।

গ্রামের হায়দার আলী, মিন্টু মিয়া, জাহানারা বেগম ও হান্নান মিয়া অভিযোগ করে জানায়, আব্দুল রাজ্জাকের সঙ্গে বয়সের পার্থক্য ছাড়াও বাবার নামের মিল নেই। কিন্তু তারপরেও মূল আসামিকে গ্রেফতার না করে নির্দোষ আব্দুল রাজ্জাক মিয়াকে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। গ্রেফতারের পরদিন আব্দুল রাজ্জাক মিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মসনদ ও সেচ পাম্পের বিদ্যুৎ বিলের কপি নিয়ে থানায় গিয়ে নির্দোষ দাবি করলেও পুলিশের হাত থেকে তাকে ছাড়াতে পারেননি পরিবারের লোকজন। যদিও তাৎক্ষণিক নামের বিষয়টি ভুল স্বীকার করে বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সংশোধনের আশ্বাস দেয়। এরপর ভুলের ঘটনাটি আদালতে অবগত করলে বৃদ্ধ আব্দুল রাজ্জাককে চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল হাজিরের নির্দেশ দিয়ে সমন দেয় আদালত। এতো দিনে নিরাপরাধ আব্দুল রাজ্জাক মিয়া ভোরাভোগ করে জামিনে বেড়িয়ে আসেন।

কারাভোগ করা আব্দুল রাজ্জাক মিয়ার চাচি আছমা বেওয়া বলেন, ‘হামার (আমার) ভাস্তে (ভাতিজা) বিনি অন্যায়তে (নিরাপরাধ) কিসক (কেন) জেল খাটল। হামাগরে (আমাদের) কিসক চোখের পানি বাড়াল। ভাস্তেক একলাই (একা) পাচেন জন্যে জেলত (কারাগার) নিয়ে গেছেন। মগেরমুল্লুক নাকি? হামরা হের সুস্তু (সুষ্ঠু) বিচার চাই!

প্রতিবেশি মীর আব্বাস বলেন, ‘নেসকো-২ এর গ্রাহক আব্দুল রাজ্জাকের একাউন্ট নম্বর ২১৯০। সে হচ্ছে প্রকৃত অপরাধী। কিন্তু নেসকো-২ এর প্রকৌশলী ভুলক্রমে নেসকো-১ এর ৫৬১/বি এর গ্রাহক আব্দুল রাজ্জাক মিয়া, পিতা সমেস উদ্দিন দিয়ে মামলাটি দেয়। যা সত্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘নেসকো-২ এর প্রকৌশলী হাজত খাটাল নেসকো-১ এর গ্রাহককে। এটা উনি করতে পারেন না; এখতিয়ার নেই তার। এ কারণে বিনাদোষে আব্দুল রাজ্জাক মিয়া জেল খেটে নানাভাবে হেনস্তা হয়েছে। আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর তদন্ত হওয়া দরকার।’

ঘটনার সত্যতা জানতে মূল আসামি বৃদ্ধ আব্দুল রাজ্জাকের মুখোমুখি বিডিপোস্ট। তবে তার নামের সেচ পাম্পটি তিনি অনেক আগেই অন্য গ্রামের আরেক মো. রাজ্জাকের কাছে বিক্রির দাবি করেন।

এ বিষয়ে বৃদ্ধ আব্দুল রাজ্জাকের স্ত্রী বাসমনি বেওয়া বলেন, ‘আমাদের নামে মামলা-টামলা আর কিচু নাই। আছিল তাক আমরা পরিশোধ করি; আমরা মুক্তি হয়া আছি। আর কোন কৈফিয়ত আমাদের কাছে নাই। যার কাছে পাম্প বেচ্চি এখন তার কাছে সব।’

এদিকে, নিরাপরাধ আব্দুল রাজ্জাক মিয়ার জেল খাটার ঘটনাকে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও গ্রাহক হয়রানির ঘটনার একটি বড় দৃষ্টান্ত বলছেন সচেতন মহল। এমন ভুলের জন্য আব্দুল রাজ্জাক মিয়ার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়াসহ তদন্ত সাপেক্ষে দায়িদের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর উপজেলা কমিউনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও আইনজীবী মুরাদুজ্জামান মুরাদ বলেন, ‘কোন ত্রুটি বা বিল পরিশোধ থাকা সত্বেও বিদ্যুৎ অফিসের এমন মামলা অযৌক্তিক। এ কারণে বিনাদোষে চারদিন কারাভোগ করেছেন আব্দুল রাজ্জাক মিয়া। এতে তিনি আর্থিকসহ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এটি বিদ্যুৎ অফিসের গাফিলতির একটি বড় দৃষ্টান্ত।’

আমি মনে করি, এটার সঠিক তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। সেই সাথে দেশের সংবিধান অনুযায়ী বিনাদোষে কারাভোগ করা ব্যক্তি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবি রাখেন বলেও জানান এই নেতা।’

তবে এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে বিদ্যুৎ অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলীর দফতরে গেলে দাম্ভিকতা ছুড়ে বসেন এই কর্মকর্তা। অকপটে সব ভুলের দায় শিকারও করেন তিনি। তবে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি তিনি। এক পর্যায়ে এই প্রতিবেদকের সাথে চড়াও হন এই কর্তা ব্যক্তি।

দায় শিকার করে তিনি বলেন, ‘বক্তব্য নিতে গেলে ভিকটিমকে নিয়ে আসেন। এটা তো সলভ ইস্যু (সমাধান হয়েছে)। এই ভুলের কারণে তাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা কেউ লোকাল না। এটা সোর্সের ভুলে হয়েছে। তারা ভুল ইনফরমেশন দিয়েছে। দুজনের নামেই আব্দুল রাজ্জাক। শুধু ভুল হয়েছে বাবার নামে। আমি তো লোকাল না; বগুড়ার ছেলে। ইনফরমার ভুল তথ্য দিলে আমার কি করার আছে।’

এটা জাস্ট মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং। এ কারণে তাকে অফিস থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হয়েছে। আরও যদি কোন ইস্যু থাকে তাহলে প্যান্ডামিকের পরে আসেন। সমাধান করে দেব।’

তিনি বলেন, ‘এখন তো মামলা ঢিসমিশ। সে এখন কী চায়! তা করে দেয়া হবে। এটা নিয়ে নিউজ করার কী আছে। আপনারা অন্য ইস্যু নিয়ে নিউজ করেন। ছোট বিষয় নিয়ে কথা বলা বা; নিউজ করে কী হবে?’

‘শেষে প্রতিবেদকের পাল্টাপাল্টি বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে উত্তেজিত হয়ে বসেন এই কর্মকর্তা। এ নিয়ে বারবার তিনি এই প্রতিবেদককে বিভিন্ন সাংবাদিক ম্যানেজের কথা তুলে ধরে করোনার পরে আসতে বলেন।’


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর

ফেসুবকে আমরা

এক ক্লিকে বিভাগের খবর