মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ০৫:২০ পূর্বাহ্ন

তালপাতার বেড়া, ছিদ্র চালায় আকাশের চাঁদ দেখেন নুরুল!

জিহাদ হক্কানী, গাইবান্ধা / ১৮৪ বার পঠিত
সময় : বৃহস্পতিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২১, ২:১১ অপরাহ্ণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নুরুল ইসলাম। বয়স নব্বই ছুঁইছুঁই। তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিলেও যুদ্ধকালীন সময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেরই নিরাপদ আশ্রয়স্থল করে দিয়েছিলেন তার বাড়িতে। সেই নুরুল ইসলাম আজ আটা-চিড়া খেয়ে রাত যাপন করছেন তালপাতার বেড়া আর ভাঙ্গা-ছিদ্র ঘরে।

পাঠক বলছিলাম, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার দামোদরপুর ইউনিয়নের উত্তর মরুয়াদহ গ্রামের বৃদ্ধ নুরুল ইসলামের কথা।

একাত্তরের সময়ে নুরুল ইসলামের ছিল প্রায় ত্রিশ বিঘা জমি। এই জমির অনেকটা অংশ তিনি দান করেন স্থানীয় উত্তর মরুয়াদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে। এরপর বাকি সম্পত্তির গুরুত্ব না বুঝে একে একে সব জমি বিক্রি করে আজ তিনি নি:স্ব। বাড়ি-ভিটার আশ্রয়ের পাঁচ শতাংশ জমি ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই আজ তার।

বয়সের ভাড়ে ন্যুয়ে পড়া নুরুল ইসলামের জন্ম ১৯৩২ সালে। সে অনুযায়ী তার বয়স দাঁড়িয়েছে ৮৯ বছরে। অথচ এ বয়সেও তার কপালে জোটেনি বয়স্কভাতা কার্ড কিংবা সরকারি কোন সহায়তা। সরকারের আশ্রয় প্রকল্পের ঘরের জন্য বিভিন্ন জনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও পাননি একটি ঘর। তাই এই বৃদ্ধকে বসবাস করতে হচ্ছে ভাঙ্গা ঘরেই। আর যে ঘরটিতে তিনি বসবাস করছেন সেটি অনেকটাই হেলে পড়েছে। এক পাশের বেড়া ভেঙে যাওয়ায় রাতে শিয়াল-কুকুরও ঢুকে পড়ে ঘরে। আর চালার ছিদ্র-ভাঙা দিয়ে তো অনাবরত রোদ-বৃষ্টি লেগেই আছে।

সরেজমিন বৃদ্ধ নুরুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্ত্রী মজিরন বেগম ও পাঁচ বছর বয়সী নাতী রোম্মান মিয়াকে নিয়ে তার সংসার। একটি টিনের ঘরে তিনজন বসবাস করেন। সেই ঘরের চারপাশের বেড়ায় ধরেছে মরিচা। একপাশের বেড়ার টিন অনেকটা অংশ ভেঙে গেছে। চার পাশের বেড়া ও চালের বিভিন্ন স্থানে মরিচা ধরে ধসে পড়েছে। এছাড়া পশ্চিম পাশের বেড়ার টিন ভেঙে যাওয়ায় অর্থাভাবে তালপাতা দিয়ে ছিদ্র ঢাকার চেষ্টা করেছেন তিনি।

এছাড়া ঘরের উপরের চালের অধিকাংশ টিনে ধরেছে মরিচা। হাত বোলালেই গুড়গুগ করে ধসে যাওয়ার অবস্থা টিনের। চালের এক পাশের সব টিন মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে গেছে। ছিদ্র হয়েছে চালের বহু অংশ। পুরো ঘরটির বাঁশের খুঁটি হয়েছে নড়বরে। এ কারণে ঘরটি খানিকটা হেলে পড়েলে। যে কোন মহুর্তে সেটি ভেঙে পড়ে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। তবুও এই তালপাতার বেড়া আর ভাঙা চালেই বসবাস করতে হচ্ছে বৃদ্ধ নুরুল ইসলামকে।

এছাড়া খাদ্যাভাবে পুরো পবিত্র রমজান মাসেই আটা-চিড়া খেয়ে রোজা রাখছেন নুরুল ও তার স্ত্রী মজিরন। এক ছেলে সেও ঢাকায় রিকশাভ্যান চালায়। চলমান লকডাউনে তিনিও বাড়িতে অবস্থান করায় আরও অর্থাভাব ও খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে পরিবারটিতে।

নাজুক চোখে তাকিয়ে বৃদ্ধ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘টিন ফাটিফুটি (ভাঙা) একেবারে ইয়া হয়া গেছে। টিন এখান উড়িও গেছি। তাও কিছু কররের পাই নেই। বেড়াও দিবের পাই নাই; টিন নাই। কলা পাতাটাতা, হাবিজাবি (ইত্যাদি) দিয়ে থুচি (রাখা)। তালের পাতা দিয়ে গুয়ের গাছের ঢোংলা (শুপারি পাতা) দিয়ে রাখছি।’

হামার (আমার) বয়স নব্বই হয়া গেছি পুরাপুরি। বহু দিন হতে ঘর দিবের পাই না। টিন ফাটিফুটি নটুরপুটুর (এলোমেলো) হয়া গেছি। ঘরের মধ্যে থাকপের পাই না; পানি। এদিক ওদিক দৌঁড়াদৌঁড়ি করি যাই; ঘরে কুত্তেটুত্তে (কুকুর-শেয়াল) হাবিজাবি ঢোকে। দু:খ; খুব দু:খ-কষ্ট।’

তিনি আরও বলেন, ‘চেয়ারম্যানের কাছে যাই, তাইও কিছু ব্যবস্থা করে না। বয়স্কভাতার কার্ড চাই! তাইও কার্ড দেয় না। সরকার বলে মেলা মানষক (মানুষ) ঘর দেয়; হামাক তো দেয় না। ঘর চালে (চাইলে) তো টেকা (টাকা) চায়!; হামি কোটে (কোথায়) পাই টেকা। নিজে খাবার পাই না। আটা খাই এনা; চিড়ে খাই এনা।’

নুরুল বলেন, ‘শেখ মুজিবুরকে দেখছি। সাল্লেপুরে (সাদুল্লাপুর) আচ্চিল (এসেছিলেন) একবার। মুক্তিযোদ্ধারা আছিল না; তারাও ওপার থাকি এপাকে (এ পাড়) আচ্চিল। বহু মুক্তিযোদ্ধা আমার বাড়িত থাকচে; হামি পহড়া (পাহাড়া) থাকছি। তামান (সব) বাড়ি দাবড়ায় (খোঁজা) আর হামি ঘরত থুয়ে (রাখা) পহড়া থাকছি।’

এ নিয়ে বৃদ্ধ নুরুল ইসলামের স্ত্রী মজিরন বেগম বলেন, ‘এই যে রোজা থাকপের নাকছি (থাকা) কত কষ্ট করি। হয় এনা আটা না হয় চিড়ে আনি খাবানাকছি (খাওয়া)। ঘরের বেড়াটেরা (বেড়া) সোক (সব) ভাঙা। কলা গাছের ঢোংলা (পাতা); তালের পাতা দিয়ে থাকি। ঝড়ি (বৃষ্টি) আলে (আসা) একনা বাচ্চা ছোল (নাতী) আছে তাক নিয়ে দৌঁড়েদৌঁড়ি করি মানষের ঘরত (ঘর) যাই। পানি পড়ে; কুত্তে (কুকুর) শিয়েল (শেয়াল) আসে, কোনটে কী করে না করে।’

দামোদরপুর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রী সোনাতন মহন্ত বলেন, ‘নুরুলকে ভাইকে তো ভাল করে চিনি। হ ভাই যুদ্ধের টাইমে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক সহযোগিতা করছে। তাই তো (নুরুল) সে টাইমে ধনি লোক আছিল। আজ তার করুণ দশা।’

এ বিষয়ে সাদুল্লাপুর উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও দামোদরপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম স্বাধীন বলেন, ‘নুরুল ইসলামের খাদ্যাভাব পরিষদের বরাদ্দ থেকে নিরসন করা হবে।’

নব্বই বছর বয়সেও বয়স্কভাতা কার্ড না পাওয়া নিয়ে সাদুল্লাপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মানিক চন্দ্র রায় বলেন, ‘ইতিমধ্যে তার বয়স্কভাতার জন্য অনলাইনে আবেদন পেয়েছি। চলতি ধাপে তিনি ভাতার কার্ড হাতে পাবেন।’

সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুর রশীদ আজমী বলেন, ‘যুদ্ধের সময় দামোদরপুর ইউনিয়নে বহু মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। যে নুরুল ইসলামের কথা বলছেন, তিনি ভাল মনের মানুষ। স্কুলে জমিও দান করেছেন তিনি।’

‘একাত্তরে তিনি এলাকার অনেক রাজাকারের তথ্য সরবরাহ করেছিলেন। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা তার আশ্রয়ে ছিলেন; কথাটা সত্য। তবে তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি বলেও জানান তিনি।’

এ বিষয়ে সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নবীনেওয়াজ বলেন, ‘নুরুল ইসলামের বাড়ি পরিদর্শন করা হবে। যেহেতু তার জমি আছে; ঘর নেই। এই প্রকল্পের ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত ঘরের বরাদ্দ পেলে তাকে ঘর করে দেয়া হবে। এছাড়া তাকে দ্রুত উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।’


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর

ফেসুবকে আমরা

এক ক্লিকে বিভাগের খবর