মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ০৪:৩৮ পূর্বাহ্ন

যৌন উষ্ণতার অশ্লীল বিজ্ঞাপন চালাচ্ছে গাইবান্ধার একাধিক ক্যাবল নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠান

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৮৩ বার পঠিত
সময় : বুধবার, ৫ মে, ২০২১, ১২:৫৪ অপরাহ্ণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দেশে কিংবা দেশের বাহিরের আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ যে কোন ঘটনার সংবাদ জানতে দর্শকরা প্রথমেই রিমোট হাতে এক নজর হলেও বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশনগুলোর দিকে ঢু মারেন। ঠিক তখনেই রিমোটের পাওয়ার বাটন চাপলেই দর্শকদের সামনে ভেসে আসছে ক্যাবল নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব ভিডিও চ্যানেলে প্রচারিত অশ্লীল ও যৌন উষ্ণতায় ভরা নাচ-গান আর বিজ্ঞাপনের দৃশ্য। তবে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা এসব অবৈধ চ্যানেলে উষ্ণতায় ভরা বিজ্ঞাপনে বিব্রত ও অতিষ্ঠ জেলার গ্রাহকসহ দর্শকরা।

জেলার ক্যাবল নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠানগুলোর এসব নিজস্ব চ্যানেলের যেমন নেই কোন বৈধতা; তেমনি বিজ্ঞাপন প্রচারেও নেই অনুমোদন। এতে করে একদিকে যেমন প্রকাশ্যেই ছড়ানো হচ্ছে অশ্লীলতা। তেমনি এসব চ্যানেলে প্রচারিত বিজ্ঞাপনেও সরকারকে দেয়া হচ্ছে রাজস্বও ফাঁকি।

চলমান এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে আঁতাত করেই অননুমোদিতভাবে বছরের পর বছর ধরে চলছে এসব অশ্লীল ভিডিও চ্যানেল। গাইবান্ধার কেন্দ্রীয় ক্যাবল নেটওয়ার্কসহ ছয় উপজেলা সবকটি ক্যাবল নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চ্যানেলে প্রতিযোগিতামূলক ভাবে প্রচার করা হচ্ছে যৌন হারবাল চিকিৎসার বিজ্ঞাপন। যা যৌন সমস্যা, শরীর মোটাতাজাকরণ হারবাল ওষধের বিজ্ঞাপন। এসব ওষধ কোম্পানিগুলোর অধিকাংশরেই আবার নেই লাইসেন্স। সেই সাথে এসব ওষধ সেবন করে অনেকেই আর্থিকসহ নানাভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে, এসব যৌন উত্তেজনার ওষদের বিজ্ঞাপনেও স্থানীয় নৃত শিল্পী এবং হঠাৎ বনে যাওয়া নায়িকা ও গায়িকাদের দিয়ে প্রচার করা হচ্ছে অশ্লীল গান-বাজনাও। এসব দেখে বাড়ির কমলমতি শিশুরা বিজ্ঞাপনের সেই অশ্লীল গানের সুর, ছন্দ আর কলি না বুঝেই যখন তখন যেখানে সেখানে কণ্ঠ মিলিয়ে আবৃত্তিসহ করছে নাচও। আর এসব দেখে লজ্জিত হওয়া ছাড়া কিছুই করার নেই বয়োজ্যেষ্ঠ, বাবা-মা ও ভাই-বোনসহ পরিবারের সদস্যদের।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাদুল্লাপুর, পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে নামসর্বস্ব হারবাল ওষধালয় প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার ফাঁদ এখন বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের শিরোনামগুলো নানা অশ্লীল ছন্দ ও শব্দমালায় উত্তেজনাপূর্ণ ভঙ্গিতে তৈরি। আর এই বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত হয়ে সমস্যাগ্রস্থরা ছুটে চলে কথিত এসব হারবাল ওষধালয়ে।

স্থানীয়ভাবে গড়ে তোলা এসব চ্যানেলের প্রচারিত বিজ্ঞাপনের শব্দমালাগুলো হয়ে থাকে এ ধরনের- ‘আপনি কি যৌন সমস্যায় ভুগছেন?’ ‘বিশেষ মুহূর্তে দুর্বল’, ‘আপনি কি মোটা হতে চান!’ ‘মহিলাদের আকর্ষণীয় ফিগার’, ‘এক ফাইলেই যথেষ্ট’ ইত্যাদি। যৌন উত্তেজনাকর এমন শব্দের বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে সাধারণ রোগীরা রহরহ হচ্ছে প্রতারিত। সেই সাথে সম্মুখিন হচ্ছে আর্থিক ক্ষতিও।

গাইবান্ধা জেলা শহরে ‘গাইবান্ধা কেন্দ্রীয় ক্যাবল নেটওয়ার্ক’, সুন্দরগঞ্জে ‘বিএসএল ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্ক’, ‘সাদুল্লাপুরে ‘ড্যাব ক্যাবল নেটওয়ার্ক’, পলাশবাড়ী-গোবিন্দগঞ্জে ‘চারমিং ক্যাবল নেটওয়ার্ক, সাঘাটায় ‘রিয়া ক্যাবল নেটওয়ার্ক’, ফুলছড়িতে ‘কচুয়া ক্যাবল নেটওয়ার্ক’ অবৈধ ও অনুনোমদিতভাবে দিধারচে চালায়ে যাচ্ছেন এসব বিজ্ঞাপন।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ফ্রিকোয়েন্সি ডিক্লারেশন এ্যাক্ট ও ক্যাবল টিভি স¤প্রচার আইন ২০০৯ অনুযায়ী ডিস প্রযুক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক নিজস্ব টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা ও বাণিজ্যিক ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি ও শাস্তিযাগ্য অপরাধ। কিন্তু গাইবান্ধায় এই ধরনের চ্যানেল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হলেও মুখবন্ধ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তাছাড়া বিদ্যুতের খুঁটিতে এ্যাম (ডিস সংযোগে ব্যবহৃত বিদ্যুৎচালিত এক ধরনের যন্ত্র) জেনারেটর ব্যবহারের জন্য এ্যাম প্রতি ১০ টাকা করে ভাড়া এবং গ্রাহকদের নিকট থেকে আদায়কৃত অর্থের শতকরা ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেয়ার বিধি-বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। এসব ক্যাবল অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করেই রমরমা বিজ্ঞাপন চালিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন।

এদিকে, জেলা ও উপজেলায় চলমান ক্যাবল নেটওয়ার্কের সকল মালিকসহ তথ্য অফিসে খোঁজ নিয়ে জেলাব্যাপী তাদের গ্রাহক সংখ্যা কত? তা জানা যায়নি। তবে জেলায় বসবাসরত পরিবারের সংখ্যাকে আনুপাতিক হারে হিসাব করলে গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দুই লক্ষাধিক। পাশাপাশি জেলাব্যাপী গ্রাহকের মাঝে ডিস লাইনগুলো পৌঁছাতে শতশত বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বসানো হয়েছে এ্যাম মেশিন। এজন্য বিদ্যুৎ বিভাগ কিংবা পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে ফি বাবদ কোন টাকা প্রদান করা হচ্ছে না বলেও সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে জানা গেছে। অথচ প্রতিজন গ্রাহক সংযোগের জন্য ৫০০ টাকা হারে অগ্রিম প্রদান বাবদ ১০ কোটি টাকা এবং মাসিক ২০০ টাকা হারে প্রতি মাসে ভাড়া ৪ কোটি টাকা জেলাজুড়ে আদায় করা হচ্ছে।

শহরের মুন্সিপাড়া এলাকার টিভি দর্শক ও স্কুল শিক্ষক ফাতেমা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, আমার আট বছর বয়সী মেয়ে ঐ সব উল্টাপাল্টা বিজ্ঞাপন দেখে সব সময় বলাবলি করে। এসব কথা রীতিমত লজ্জাকর হলেও শিশুদের মুখে মুখে ফিরছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক বলেন, ডিস লাইনে এই সব অশ্লীল বিজ্ঞাপন চটকদার হওয়ায় শিশুদের আকৃষ্টি করছে। যা তাদের শারীরিক ও মানষিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এ বিষয়ে ক্যাবল অপারেটর এ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (কোয়াব) গাইবান্ধা জেলা কমিটির সভাপতি ছানোয়ার হোসেন দিপু বলেন, বর্তমানে আমাদের সেন্ট্রাল কমিটির সকল কার্যক্রম বন্ধ আছে। সেই সাথে তিনি ক্যাবল অপারেটর মালিকদের অশ্লীশ বিজ্ঞাপন প্রচারে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন।

গাইবান্ধা জেলা তথ্য অফিসার মো. মাহাফুজার রহমান বলেন, আমি সদ্য যোগদান করেছি। ক্যাবল নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিজস্ব চ্যানেল খুলে বিজ্ঞাপন প্রচার করে তবে এটি অবশ্যই আইন বহিভ‚ত ও অন্যায় কাজ। সম্প্রতি তথ্য মন্ত্রনালয় এসব অবৈধ চ্যানেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ইতোমধ্যে দেশের কয়েকটি জেলায় ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে ক্যাবল নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠানের গুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গাইবান্ধা জেলায় যদি এ ধরনের অবৈধ চ্যানেল থাকে তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জেলা প্রশাসক আবদুল মতিন জানান, এই বিষয়ে জেলা তথ্য অফিসকে বিষয়টি তদন্ত করতে বলা হয়েছে। তদন্তে সতত্য পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর

ফেসুবকে আমরা

এক ক্লিকে বিভাগের খবর