বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ০৯:২৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম
শিরোনাম
গাইবান্ধায় দর্জি শিক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা ও সেলাই সামগ্রী বিতরন স্থানীয় সম্পাদকদের সাথে প্রেসক্লাব গাইবান্ধার মতবিনিময় ক্রেতা সেজে গাজা ব্যবসায়ীকে নিজেই গ্রেফতার করলেন ডিবির ওসি ভূয়া র‌্যাব পরিচয়ে প্রতারনা, যুবক গ্রেফতার রকি হত্যা মামলার প্রধান আসামী কাঞ্চন ও সোহাগ গ্রেফতার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিলেন আতোয়ার রহমান জাফরুল স্মৃতি সংসদ নাইট ফুটবল টুর্নামেন্টে শিরোপা জয়ী টিম মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড বোয়ালীর জনগনের সেবক হিসেবে কাজ করতে চান জাহিদ গাইবান্ধা পানি নিস্কাশন ড্রেন ও স্লাব নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করলেন-হুইপ মা হারালেন সাংবাদিক সম্রাট!

হাত বদলালেই তরমুজের দাম বাড়ে পাঁচগুন

জাভেদ হোসেন, নাটোর ঘুরে এসে: / ১৮৩ বার পঠিত
সময় : শনিবার, ৮ মে, ২০২১, ২:৩৯ অপরাহ্ণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সারাদেশে তরমুজের দর-দাম ও কেজিতে বিক্রি নিয়ে চলছে আলোচনা ও সমালোচনাসহ নানা বিতর্ক। রীতিমতো এই তরমুজ নিয়ে পত্রিকায় কলাম লেখালেখিসহ চলছে টেলিভিশন টকশোও। এসবের মাঝেও বাজারে কমেনি এই গ্রীষ্মকালীন সুস্বাদু রসালো ফলের দাম।

বর্তমানে প্রতি কেজি তরমুজ উৎপাদিত জেলার পাশের জেলাতেই বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে। তার একটু দূরবর্তী জেলাগুলোতে আবার বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে। তাছাড়া রাজধানী ঢাকায়  আরও চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে তরমুজ।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় চলমান লকডাউনের প্রভাবে পণ্য পরিবহণসহ কেনা-বেচা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা। কিন্তু লকডাউনের মধ্যেও পণ্য যাতায়াতসহ স্বাস্থবিধি মেনে হাট-বাজার খোলা রাখার খবর ছিল প্রান্তিক কৃষকদের জন্য আর্শিবাদ। কিন্তু পাইকারি ব্যবসায়ীদের মধ্যস্বত্বাভোগী এক শ্রেণির সিন্ডিকেটের কারণে ফড়িয়া ও খুচরা ব্যবসায়ীরা লাভবান হলেও এই তরমুজে কপাল পুড়েছে প্রান্তিকের হাজারো কৃষকের। সারাদেশে ভিন্ন ভিন্ন জেলায় এই রকম খবরের পাশাপাশি উত্তরের জেলা নাটোরেও দেখা গেছে এমন চিত্র।

এই জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার চরকাদহ এলাকাসহ চলনবিল জুড়েই শতশত হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে গ্রীষ্মকালীন ফল তরমুজ। এখানকার উৎপাদিত এসব তরমুজের ওজন সর্বনিম্ন ৪ থেকে সর্বোচ্চ ১৬ কেজি পর্যন্ত।

এদিকে, গত সপ্তাহে কৃষকরা শতকরা হিসাব ধরে ১৫ থেকে ২৩ হাজার টাকা পর্যন্ত জমিতেই বিক্রি করেন তরমুজ। অথচ এক সপ্তাহের ব্যবধানেই দাম কমেছে অর্ধেকের নিচে। শতকরা ১০ হাজার টাকার নিচেও মিলছে না পাইকার। এ কারণে জমির সব তরমুজ একসাথে বিট কাভার পদ্ধিতির মাধ্যমে বিঘা ধরে ক্ষতি বুঝেও বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন এখানকার প্রান্তিক কৃষকেরা।
শুধু তাই নয়; অনেক কৃষক খুচরা কিংবা ফড়িয়া ব্যবসায়ীর মাধ্যমেও তরমুজ বিক্রি করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন। তাই শেষমেষ জমির মালিক নিজেরাই তরমুজ নিয়ে বসেছেন সড়কের পাশে। দিনভর একটা দুইটা করে পিস ধরে কোনমতে তরমুজ বিক্রির চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক শ্রেণির পাইকারি ব্যবসায়ী প্রান্তিক চাষীদের মাঝে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছেন। তারা কৃষকদের বলছেন, ঢাকায় পানির দামে বিক্রি হচ্ছে তরমুজ। তাই দাম নেই। সিন্ডিকেটের এমন কথা সত্য ভেবে এবং অনেকেই চিন্তায় পড়ে বাধ্য হয়ে পানির দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

নাটোর-পাবনা আঞ্চলিক মহাসড়কের বিস্তৃর্ণ চলনবিল এলাকা জুড়েই চলতি বছর ব্যাপক হারে তরমুজের ফলন চোখে পড়ার মতো। তরমুজের পাশাপাশি বাঙ্গি চাষও হয়েছে এখানে। চলনবিল এলাকার চরকাদহ গ্রামের আশরাফুল ইসলাম চলতি বছর তার দুই বিঘা জমিতে চাষ করেন এশিয়ান-২ (বাংলালিংক) জাতের তরমুজ। লাভের আশায় জমিতে বীজ বপন থেকে শুরু করে ফলন আসা পর্যন্ত তার খরচ হয় এক লাখ ২০ হাজার টাকা। এই জমি থেকে গত শুক্রবার শতকরা হারে ১০০ পিস তরমুজ ১ হাজার ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করেন তিনি। সাথে ফ্রিও দিয়েছেন পাঁচটি তরমুজ।এরপর থেকে জমিতে বিক্রি উপযোগী পাঁচ শতাধিক তরমুজ থাকলেও খুচরা ব্যবসায়ী কিংবা পাইকারের দেখা না মেলায় জমিতেই তা নষ্ট হওয়ার উপক্রম।

চাষী আশরাফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘হেদিন (সেদিন-শুক্রবার) বেচনো (বেচা) আঠারো হাজার টেহা শও (শত)। আজ বেচাহালামু (বিক্রি); কিন্তু একটা পার্টিও (ক্রেতা) নাই। বেইচতে পারতিছিনা; কয় ৭ হাজার; ৬ হাজার টেহা শও-নি। এহন তাও নিচ্ছে না নি।’

তিনি বলেন, ‘দুই বিঘা জমি আবাদ করিছি (করা)। ১ লাখ ২০ হাজার টেহা খরচ পড়িছি। বেচিছি (বিক্রি) ১৮ হাজার।। এহন (এখন) কোন পার্টিই তরমুজ লিচ্ছে (নেয়া) না কো। এহন গোটাটাই (সমস্ত) তো আমোরে (আমাদের) লচ।’

পাইকারী ব্যবসায়ী না পেলে উৎপাদিত তরমুজ কীভাবে বিক্রি করবেন। এমন প্রশ্নের জবাবে আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘এই তরমুজ এহন কি করমু; জমিতেই পঁচি (নষ্ট) যাবি। আর না হয় গরু-বাছুর দিই (দিয়ে) খওয়াইলাগবি। তাছাড়া তো বুদ্ধি নাই কো।’

চলনবিলে কৃষক আশরাফুলের জমির পাশেই তার আরও তিন ভাই ফরিদুল ইসলাম, আনারুল ইসলাম ও সাইফুল ইসলাম সাত বিঘা জমিতে একাধারে আবাদ করেছেন তরমুজ। তিন ভাইয়ের মধ্যে আনারুল ১৫ হাজার ও সাইফুল ১৭ হাজার টাকার তরমুজ এ পর্যন্ত বিক্রি করেন। বর্তমানে পাইকার না পেয়ে অনেকটাই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।

একই গ্রামের আবু তালেব মিয়া একজন প্রান্তিক কৃষক। প্রতিবারের ন্যায় চলতি মৌসুমে ‍তিনি চলনবিলে দেড় বিঘা জমিতে চাষ করেন তরমুজ। আর এই জমিতে ফল আসা পর্যন্ত তাকে খরচ করতে হয় ৮০ হাজার টাকার উপরে। অর্থের পাশাপাশি নিজের শ্রম ও পরিচর্যায় ফলনও ভাল হয়। কিন্তু তরমুজ জমিতে বিক্রির উপযোগী হওয়ার পর তিনি দু’চোখে দেখছেন ধোঁয়াশা। ভুগছেন হতাশায়। গত তিনদিন ধরে হন্য হয়ে খুঁজেও পাইকারের দেখা পাননি তিনি। পরে বাধ্য হয়ে দেড় বিঘা জমির সাড়ে ১১শ তরমুজ একসঙ্গে বিক্রি করে দেন (বিট কাভার) মাত্র ৬০ হাজারেই।

এতে করে প্রতি পিস তরমুজ এই কৃষক বিক্রি করেন মাত্র ৫২ টাকায়। আর এই উৎপাদিত তরমুজ ৩ থেকে ১৪ কেজি পর্যন্ত ফলন দেয়। যার গড় ওজন ছিল ৫ কেজি। তাহলে প্রতি পিস তরমুজ ৫২ টাকায় বিক্রি হলে তা কেজিতে দাঁড়ায় সাড়ে ১০ টাকা। এতে করে এই কৃষকের লাভের হিসেব তো দূরের কথা বরং ২০ হাজার টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে এ বছর তরমুজ চাষ করে।

এ নিয়ে কৃষক আবু তালেব মিয়া বলেন, ‘আমার জমির তরমুজ বিক্রি হচ্চি না। কিন্তু খরচ কচ্ছি প্রচুর টেহা (টাকা)। এহন (এখন) বিচা (বিক্রি) না হওয়ায় সব একিবারে (একসাথে) বিচ্চি (বিক্রয়) ৬০ হাজার টেহায়। খরচ হলি (হয়েছে) ৮০ হাজার টেহা; বিচ্চি ৬০ হাজারত। তাইলে বউ-ছোল খাইটা (পরিশ্রম) তরমুজ বইয়ে (চাষ) কী হলি।

দেড় বিঘা জমির তরমুজ কী পদ্ধতিতে বিক্রি করেছেন; এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শও-তে (শতক) তো তরমুজ নিচ্ছি (নেয়া) না কেউ। আগত হেরা (পূর্বে অন্যান্য কৃষক) শও ধরি বিচ্ছি। এহন নেয় না; তাইলে কী করি। দেড় বিঘেতে সাড়ে ১১শ তরমুজ হচিল। তাক বিচ্চি খালি ৬০ হাজারত। বিটকাভার ধরি। তালি (তাহলে) কয় টেহা করি পড়িছে। কৃষক হামরা তালি পরি বাঁচি কিবা কইরে।’

চলনবিলের আরেক তরমুজ চাষী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘দেড় লাক (লাখ) টেহা (টাকা) খরচ হচি (হওয়া) ৩ বিঘে জমিত। এহন ঢাকা বলতিচে; দাম কম। বিধায় হেটি আমাগড়ে (আমাদের) বিঘে (বিঘা) ধরি (ধরে) ৮ হাজার, ৫ হাজার টেহাও দাম কচ্ছি।
তিনি বলেন, ‘এহনও খরচি (খরচ) তোলতি (উঠানো) পারি নাই কো। লচে (ক্ষতি) আছি ১ লাক (লাখ) টেহা। কালি (গতকাল) বিচ্ছি (বিক্রয়) ৯ হাজার টেহা শও। আজ ফির কচ্ছি শও হবেরলয় (হবে না); বিট কাভার। হামাগকে ওরা দাম দিচ্ছি না কো তরমুজের।’

এদিকে, পাশাপাশি জমিতে তরমুজ ও বাঙ্গির বাম্পার ফলনেও মুখে হাসি নেই কৃষকদের। ক্রেতা না পেয়ে জমির ফলন নষ্ট হচ্ছে সেখানেই। বাধ্য হয়েই এসব কৃষক জমি থেকে তরমুজ তুলে পথে-ঘাটে পিস হিসেবে বিক্রি করছেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে নাটোর-পাবনা আঞ্চলিক মহাসড়কের গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিসা এলাকায় সড়কের পাশে পিস হিসেবে তরমুজ বিক্রি করছিলেন সিধুলি গ্রামের সেন্টু মিয়া।

তিনি জানান, ‘কয়েকদিন ধরে তরমুজের পাইকার নেই। বিঘা প্রতি তরমুজের দাম উঠছে মাত্র ১৫ হাজারে। যা খরচের তিনগুনেরও কম।

সেন্টু মিয়া বলেন, ‘ছোট ভাই করিছে দেড় বিঘে। আমার বড় ভাই করিছে এক বিঘে। এমনিভাবে আমরাই পাঁচ বিঘে জমিতে তরমুজ করিছি। কিন্তু পাইকারি খরিদার নাই। জমিতেই নামে না। যার কারণে অল্প কিছু তুলি; রোডে লিয়েআইসে এই যে বেচ্চি।’

চলনবিলসহ এই জেলার উর্বল মাটিতে এশিয়ান-২ (বাংলালিংক), বিগ ফ্যামেলী, ব্লাক সুইট, থাইল্যান্ড-২, মিঠাল সুইট ও কালো জাম্পুসহ বেশ কয়েকটি জাতের দেশি-বিদেশি তরমুজ চাষ করা হয়। এ বছরের জানুয়ারিতে শীষ্মকালীন এই ফলের বীজ বপনের চার মাস পর ফলন আসে এপ্রিলে। ভাল ফলনে কৃষকরা আর্থিক দৈন্যদশা কাটিয়ে উঠতে তাই আগাম তরমুজ চাষ করেছিলেন। কিন্তু প্রথম দিকে অল্প সংখ্যক কৃষক লাভেও মুখ দেখলেও বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠরাই রয়েছেন ক্ষতির মুখে।

প্রান্তিক এসব কৃষকরা অর্থের জোগানের পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম করে ভাল ফলন তোলার পরেও রয়েছেন ব্যাপক ক্ষতির মুখে।

নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সুব্রত কুমার সরকার জানান, ‘চলতি মৌসুমে জেলায় ৮৬৮ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। যার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩৬ হাজার ৪৫৬ মেট্রিক টন। এছাড়া তরমুজের পাশাপাশি বাঙ্গি চাষ করা হয়েছে ৭৫২ হেক্ট্রর জমিতে। আর এই বাঙ্গির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৬ হাজার ৫৪৪ মেট্রিক টন।

তিনি আরও জানান, ‘জেলার সাত উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপকহারে বাঙ্গি ও তরমুজের আবাদ হয়েছে গুরুদাসপুরের চলনবিলের চরকাদহে। ফলনও হয়েছে বাম্পার।’

কয়েক দিনের ব্যবধানে তরমুজের বড় দরপতন ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট সম্পর্কে সুব্রত কুমার সরকার বলেন, ‘ইতোমধ্যে গত ২ মে থেকে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে তরমুজ সংগ্রহের পর বিক্রি কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট ভেঙে কৃষক ও ভোক্তা পর্যায়ে তরমুজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতেই এমন উদ্যােগ নেয়া হয়।’


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর

ফেসুবকে আমরা

এক ক্লিকে বিভাগের খবর