মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ০৫:০৩ পূর্বাহ্ন

ঠেলাগাড়ির ভ্রাম্যমাণ সেলুন

জিহাদ হক্কানী / ১৩৮ বার পঠিত
সময় : মঙ্গলবার, ২৫ মে, ২০২১, ৬:২৭ অপরাহ্ণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অর্থের অভাবে দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে হেয়ার কার্টিং (সেলুন) করার সামর্থ নেই গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার আবদুল বারিক ও জুলফিকার নামে নরসুন্দর দুই ভাইয়ের। নিরুপায় হয়ে টেম্পুর চার চাকার উপর লোহার ফ্রেমে টিনের এক চালা দিয়ে তৈরি করেছেন ঠেলাগাড়ির ‘ভ্রাম্যমাণ সেলুন’।

এই ভ্রাম্যমাণ সেলুনে চুল-দাড়ি কাটতে প্রতিদিন ভিড় করেন তরুণ, যুবক, শিশু ও বৃদ্ধসহ বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষ। এছাড়া পথে-ঘাটে ও শহর-গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে মানুষের চুল-দাড়ি কাটছেন তারা। এমনকি ফোন করলে হোম সার্ভিসও দিয়ে থাকেন নরসুন্দর দুই ভাই। কম টাকায় চুল-দাড়ি কাটতে স্থানীয়দের কাছে ভ্রাম্যমাণ সেলুনটি এখন অনেকটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

নরসুন্দর আবদুল বারি ও জুলফিকারের বাড়ি গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের টনপাড়া গ্রামে।

দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে ফুলছড়ির উপজেলার কেতকির হাটে দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে একটি সেলুনে (হেয়ার কার্টিং) কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা। কিন্তু গেল বছরের বন্যায় ওয়াবদা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধ ভেঙ্গে দোকানটি নদীগর্ভে বিলীন হয়।

মানুষের চুল, দাড়ি, গোঁফ কাটিয়ে দিনে যে টাকা উপার্জন করেন তা দিয়ে কোনো মতো সংসার চলতো তাদের। অর্থাভাবে পজেশন (জামানত) দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় সেলুন করার সামর্থ না থাকায় তাদের আয় রোজগারের পথ বন্ধ হয়। পরিবার পরিজন নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন তারা।

আবদুল বারি ও জুলফিকার জানায়, বন্যা আর নদী ভাঙনে কয়েক বছর আগেই পৈত্রিক ভিটেমাটি হারিয়ে নি:স্ব হতে হয়েছে তাদের। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আবদুল বারিকে শ্বশুর বাড়িতে আর জুলফিকারের আশ্রয় হয় অন্যের জমিতে। দুই ভাইয়ের উপার্জনের টাকায় জোটে একক পরিবারের ১০ সদস্যের খাবার। অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী তাদের। আবদুল বারি ও জুলফিকার আলীর পুঁজি বলতে কিছুই নেই। বাজারে কিংবা নির্দিষ্ট জায়গায় সেলুন করতে জামানতের (অগ্রিম) যে টাকা দিতে হয় তারও সামর্থ নেই তাদের।

এদিকে জীবিকার জন্য আপন কর্মের তাগিদেই দুই ভাই মিলে একটি ভ্রাম্যমাণ সেলুন তৈরি করেন। পুরাতন চারটি টেম্পুর চাকা দিয়ে কাঠ-লোহার ফ্রেমের উপর টিনের একচালা দিয়ে বানিয়েছেন ঠেলাগাড়ি। আর তার সাথে যুক্ত করেছেন একটি রঙ্গিন বড় ছাতা। ভ্রাম্যমাণ সেলুনের দু’ পাশে দুটি চেয়ার, মাঝ খানে বসানো হয়েছে আয়না। আয়নার সামনে দু’পাশে খুর, কাচি, চিরুনী, ফিটকেড়ি ও পাউডারসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি। আর সন্ধ্যা-রাতে আলোর জন্য বসানো হয়েছে একটি সৌরবিদ্যুৎ (সোলার)।

এই ভ্রাম্যমান সেলুন তৈরিতে তাদের খরচ করতে হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। গত দেড় বছর ধরে ভ্রাম্যমাণ সেলুন নিয়ে কখনো হাট-বাজার কখনো গ্রামগঞ্জের মোড়ে-মোড়ে ঘুরে খোলা আকাশের নিচে মানুষের চুল, দাড়ি কাটছেন তারা। প্রতিদিনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেলুনে কাজ করে যা আয় করেন; তা দিয়েই পরিবার-পরিজন নিয়ে চলছে তাদের জীবন। অর্থ-কষ্টে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে তাদের। অথচ সরকারী-বেসরকারী কোন সাহায্যে-সহযোগিতাও কখনো মেলেনি।

সেলুনে আসা কাষ্টমারসহ স্থানীয়রা জানান, হাট-বাজার ও শহরের সেলুনে চুল-দাড়ি কাটলে ৫০ থেকে ৮০ টাকা দিতে হয়। তার চেয়ে হাতের কাছে ভ্রাম্যমাণ সেলুনে চুল-দাড়ি কাটানো যায় মাত্র ২০ থেকে ৩০ টাকায়। খোলামেলা পরিবেশ হলেও নরসুন্দর দুই ভাইয়ের অন্তরিকতায় চুল-দাড়ি কাটা ও সেবায় স্বস্তি আর খুশি অনেকেই।

আধুনিকতা ও প্রযুক্তির কল্যাণে ভ্রাম্যমাণ সেলুন এখন অতীত আর বিলুপ্তির পথে। সেখানে বর্তমান সময়েও আবদুল বারি ও জুলফিকারের ভ্রাম্যমাণ সেলুনের দেখা মিলছে। পেশায় নরসুন্দর এই দুই ভাইয়ের জীবন-জীবিকার পরিবর্তনে সরকারী-বেসরকারী সহায়তার দাবি স্থানীয় এলাকাবাসীর।

সেলুনে চুল কাটতে আসা মানিক মিয়া বলেন, ‘এটা ঠেলাগাড়ি অবস্থায় আছে। তারা গরিব মানুষ। দোকান ভাড়ার টেকা নাই। গাড়ি ঠেলে ঠেলে চুল কাটি বেড়ায়।’

স্থানীয় লাল মিয়া বলেন বলেন, ‘আগে তো গ্রামে গ্রামে খুর-কেচি নিয়ে নাপতেরা ঘুরি বেড়াছে। সেগলে তো এখন নাই। এখন এমারে ঠেলাগাড়ি দেখি খালি। এমাক ফোন করলে বাড়িতেও যায়। এটাই তো সুবিধা।’

গ্রামের আয়েন উদ্দিন বলেন, ‘এমার খুব নাম-ডাক। কাম ভাল। ভাল ব্যবহার। টেকা কম নেয়। বাজারত চুল-দাড়ি কাটলে ৮০-৯০ টেকা নেয়। আর এমাক ২০ টেকা দিলেও নেয়। আপত্তি নাই।’

এক কাস্টমার বলেন, ‘ধুলে-বালি আসে। সেই রকম পরিবেশ এখনো হয় নাই। যদি ভাল পরিবেশ পায়; তাইলে চুল কাটা আরও উন্নত হবে আমাদের।’

নরসুন্দর জুলফিকার বলেন, ‘২০০১ সাল থাকি আমি এই কাজে জড়িত। ১৯ সালের ভয়াবহ বন্যায় আমার দোকানপাট ভাঙি যায়। এখন ভাম্যমাণ সেলুনে চুল কাটতিছি। গ্রামে গ্রামে চুল কাটি আমার জীবনটা খুব কষ্টে কাটতিছে।’

তিনি বলেন, ‘একটা দোকান হলি খুব সুন্দর হয়। মানুষের চুল-দাড়ি কাটি একটু সুন্দরভাবে ডাল ভাত খাইতে পারতাম।’

আবদুল বারিক বলেন, ‘অভাবের কারণে এই কাজটা করি খাই। বাচ্চা-কোচ্চা বাঁচান নাগে। শারীরিক অবস্থাও আমার ভাল না; অন্য কামও করতি পারি না।’

তিনি বলেন, ‘সরকার যদি আমাদের একটা ঠিকানা করি দিল হয়; বউ-বাচ্চা নিয়ে ভাল থাকপের পালেম হয়। হামার তো টাকা নাই যে, ঘর দিমো।’

আবদুল বারি ও জুলফিকারের গড়ে তোলা ভ্রাম্যমাণ সেলুনের জনপ্রিয়তার কথা জানা আছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির। দুই ভাইয়ের জন্য একটি সেলুনের (দোকান) ব্যবস্থা করাসহ তাদের স্থায়ী বসবাসে ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন কঞ্চিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. লিটন মিয়া।

তিনি বলেন, ‘এই ছেলেটি যে ভাসমান সেলুন দিয়েছে; সে দরিদ্র ফ্যামেলির একটা ছেলে। কিন্তু তার নিজের চেষ্টায় এটা হয়েছে। ছেলেটার নিজ বুদ্ধিতে ভাসমান সেলুনটি যে কোন জায়গায় কার্যক্রম চালাতে পারছে। এখানকার সাপ্তাহিক বাজারগুলোতেও ওর ভাসমান সেলুন নিয়ে গিয়ে কাজ করে।’

আমি মনে করি বাংলাদেশে ভাসমান সেলুন এই ছেলেটি প্রথম ব্যবস্থা করেছে। আমি মিডিয়া বা পেপার পত্রিকায় আল কোথাও পাইনি।’

চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যান হিসেবেও তাকে সহযোগিতা করবো ঘর পাওয়ার জন্য। এছাড়া তাদের বাসস্থান ও দোকানঘর করতে সব ধরনের সহযোগিতা করবো।’


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর

ফেসুবকে আমরা

এক ক্লিকে বিভাগের খবর